শীতের সন্ধ্যা, কলকাতার এক নামকরা হোটেলে জড়ো হয়েছে শহরের একাধিক প্রভাবশালী মানুষ। তারা সবাই এখানে এসেছিল এক বিশেষ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে, যা আয়োজিত হয়েছিল একটি বড় ব্যবসায়ী মহেশ্বর পালের সম্মানে। তিনি ছিলেন শহরের অন্যতম ধনী ব্যক্তি, যার প্রভাব সব জায়গায় বিস্তৃত। সবার মুখে তার সফল ব্যবসা নিয়ে বাহবা ছিল, কিন্তু রাতের অন্ধকারে তার জীবনের অজানা সত্যি বেরিয়ে এল।
মহেশ্বর পালের গেস্ট হাউসে ঘটে যাওয়া ঘটনা প্রথমে মনে হয়েছিল একটি সাধারণ দুর্ঘটনা, কিন্তু বিষয়টি খুব দ্রুত জটিল হয়ে উঠল। মহেশ্বর পালের নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পর, তার ব্যক্তিগত সহকারী, সঞ্জীব, তার ঘর থেকে এক অদ্ভুত চিঠি পেয়েছিল, যেটি নিখুঁতভাবে তার মৃত্যুতে আলোকপাত করেছিল। চিঠিটিতে লেখা ছিল, “তাসের খেলা শুরু হয়েছে, কিন্তু আজকের খেলা শেষ হবে তোমার শেষ চিপের সঙ্গে।”
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেল যে, মহেশ্বর পালের অফিসে এক বিশেষ তাসের খেলার টেবিল ছিল, যা প্রতিদিন ব্যবহার করা হতো। তার পরিবারের সদস্যরা জানান যে, মহেশ্বর পালের সবসময় তাসের খেলা পছন্দ করতেন। তবে আজ রাতে তার অদ্ভুত শর্তের তাসের খেলা নিয়ে কিছু ঘটেছে—আর সেই কারণেই এই খুনের ঘটনা।
তদন্তে নামলেন কলকাতার শীর্ষ গোয়েন্দা, অভিজ্ঞান রায়। অভিজ্ঞান রায় তার তীক্ষ্ণ মেধা এবং পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার জন্য পরিচিত। তিনি হোটেলের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর, দ্রুতই ঘটনাস্থলে পৌঁছালেন। সেখানে গিয়ে তিনি প্রথমে মহেশ্বর পালের ব্যক্তিগত সহকারী, সঞ্জীবের সঙ্গে কথা বললেন। সঞ্জীব তার বক্তব্যে বলল, “স্যার, তিনি কখনোই কোনো বিপদের মধ্যে পড়েননি। এই চিঠি কোথা থেকে এল? আমি জানি না।”
অভিজ্ঞান প্রশ্ন করলেন, “চিঠি পাওয়ার পর আপনি কিছু করেননি? কোনো সন্দেহজনক ব্যক্তি দেখেছেন?”
“না, স্যার। আমি কিছু বুঝতে পারিনি। চিঠি পড়ার পর সরাসরি পুলিশে জানালাম। কিন্তু কেউ আমার কথা বিশ্বাস করছিল না,” সঞ্জীব কাঁপতে কাঁপতে বলল।
অভিজ্ঞান রায় ঘটনাস্থল পরীক্ষা শুরু করলেন। হোটেলের ব্যক্তিগত কক্ষে ঢুকেই তিনি লক্ষ্য করলেন, টেবিলের উপর কিছু তাস পড়ে রয়েছে। কিন্তু একটি তাস ছিল সঠিক জায়গায় নয়, এটি সোজা চিরকুটের ওপর ছিল, যেন কোনো কিছু গোপন করার জন্য এখানে রেখেছে।
অভিজ্ঞান রায় তাসের খেলার নিয়ম ও মাহাত্ম্য খুব ভালো করেই জানতেন। তিনি দ্রুত সেই তাসগুলোর গঠন বিশ্লেষণ করলেন। তিনি বুঝতে পারলেন যে, এখানে এক বিশেষ কৌশল রয়েছে, যা অপরাধীর খুঁজে পাওয়া সহজ করবে। তিনি তার সহকারীকে নির্দেশ দিলেন—“এই তাসের গঠন সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করো, আর দেখো কিসের দিকে ইঙ্গিত করছে।”
একটু পরেই অভিজ্ঞান সঞ্জীবকে আবার ডেকে বললেন, “তুমি যদি একটু জিজ্ঞাসা করো, তোমার বসের তাসের খেলার প্রেম বা ঐতিহ্য সম্পর্কে কোনো কিছু জানো কি?”
সঞ্জীব বলল, “হ্যাঁ, স্যার। তাসের খেলা তার নিত্যদিনের রুটিন ছিল। তবে একদম আজ রাতে যে খেলা শুরু হয়েছিল, সেটা তার কাছে কিছুটা নতুন ছিল।”
অভিজ্ঞান রায় তখন তাসের খেলার টেবিলের দিকে তাকালেন, একটি তাস খুলে দেখলেন। এটা ছিল ‘জোকার’ তাস, কিন্তু সেটি যেন বিশেষ কিছু ছিল। সে তাসের মধ্যে ছিল এক খুনির সিগনেচার। অভিজ্ঞান দ্রুত সব কিছু জেনে গেল। মহেশ্বর পালের ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী, দানেশ, সেই খুনের পিছনে ছিল।
দানেশের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে, তিনি মহেশ্বরকে অনেক সময় নানা রকম হুমকি দিয়েছিলেন, তবে কোনোভাবে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু আজ রাতে তাসের মাধ্যমে, দানেশের আগ্রাসী মনোভাবটি পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। তিনি ওই তাসের খেলার মাধ্যমে তার রাগ এবং প্রতিশোধ নিতেন।
অভিজ্ঞান দ্রুত পুলিশের মাধ্যমে দানেশকে আটক করলেন। আর তারপর তার মুখে বেরিয়ে এল সব কিছু। সে বলল, “আমি অনেক বছর ধরে মহেশ্বরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিলাম। আমি জানতাম, একদিন সে আমাকে ছাড়বে না। তাই তাকে শেষ পর্যন্ত শেষ করে দিলাম। তাসের খেলা ছিল আমার পরিকল্পনার অংশ।”
মহেশ্বর পাল, তার অপরাধমূলক প্রতিযোগিতা এবং পেছনের কৌশলগুলোকে দূরে রেখে চলে গিয়েছিলেন, কিন্তু তার অবশেষ ছিল এক ভয়ঙ্কর পরিণতি। অভিজ্ঞান রায় আবারও প্রমাণ করলেন, তার দক্ষতা এবং অনবদ্য মেধার মাধ্যমে কীভাবে কোনো অপরাধের পেছনের আসল রহস্য উদঘাটন করতে হয়।
